জলদস্যুতার মুখ ও মুখোশ

জলদস্যুতার মুখ ও মুখোশ

মুখবন্ধ

সুস্থির হয়ে থাকা বোধ হয় মানুষের ধাতে নেই। কোন অজানা প্রাক-প্রারম্ভিক অতীতে যাত্রা শুরু ক’রে মানুষ কেবল লড়াই করে চলেছে। যুদ্ধের একটা মুখরোচক বাহানা খাড়া করা হয় যে যুদ্ধ না করলে মানুষ ক্রমশ দুর্বল ও ক্ষীণ হয়ে পড়বে। যুদ্ধের জন্য তৈরী না হলে মানুষের সাহস, শৌর্য, আত্মবলিদানের মহৎ প্রণোদনা সব চলে যাবে। তা ছাড়া এই পৃথিবীতে কেবল বীরেরাই, যোগ্যতমরাই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে। অথচ মর্ত্যে যদি কেউ নরকের প্রতিচ্ছবি দেখতে চান তবে যে কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে গেলেই চলবে।

যাই হোক আপন শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় উদগ্রীব মানুষ নিজের প্রয়োজনটুকু মিটিয়ে শান্ত থাকেনি, শাস্ত্রের বিপরীতে গিয়ে বারেবারে অন্যের ধনলুন্ঠনে প্রবৃত্ত হয়েছে। পরস্বাপহরণের নানাবিধ উপায়ের মধ্যে একটা হল জলদস্যুতা। বস্তুত এর বিস্তৃতি ও সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক তাৎপর্য একে অন্য সব পথের চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। জলদস্যুতা এক প্রকারের যুদ্ধ। কখনো তা পূর্ণ যুদ্ধের প্রতিরূপ।

চারপাশে উপুর করা আকাশ ও তাকে ছুঁয়ে থাকা অগাধ সীমাহীন উত্তুঙ্গ জলরাশি, পদে পদে বিপদ, অজানা ঘূর্ণীসঙ্কুল জলপ্রবাহ, অন্য জলদস্যুদের চকিৎ হানা, ঝড়-তুফান, হিমশৈলের চোরা আঘাত, রসদের অপ্রতুলতা একে একই সঙ্গে রোমাঞ্চকর ও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। অজানার আকর্ষণ যেহেতু চিরঅমলিন তাই মানুষের কাছে বিশেষত বালক-বালিকা, কিশোর-কিশোরী তরুণতরুণীদের কাছে এর গল্পের অমোঘ অনিঃশেষ আবেদন। আর এই আবেদন কাজে লাগিয়ে ইউরোপীয় মহাসংঘের সারস্বত সমাজ অনেক রোম্যান্টিক গল্পের অবতারণা করেছে।

শুধুই রোমাঞ্চ? সাহস, বুদ্ধি, কৌশল, দৈহিক ও মানসিক মজবুত গঠন যাদের আছে তারাই পারে এই ধরণের অভিযান অধিগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু কে কবে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়? সব মানুষেরই সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনের দুর্দম আকাঙ্খা থাকে। কিন্তু জলদস্যুর তো তা পাওয়া সম্ভব নয়। তবে কীসের হাতছানিতে তারা এই অসহনীয় কাজে নিযুক্ত হ’ত? আপাতদৃষ্টে সহজে ধনী হওয়ার এটা একটা পথ। কিন্তু ঠিক এখানেই প্রশ্ন। এই সহজ সত্যটা উপেক্ষা করা যায় না যে কাজটা অনৈতিক এবং শাসকের রোষানলে পড়া অবধারিত এবং তাদের দ্বারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেসব এড়িয়ে এঁরা কী করে সফল জলদস্যু হতেন? সবাই হতেন না কিন্তু অনেকেই তো হতেন এবং সামাজিক মর্যাদা লাভ করেতেন। আর একটা প্রশ্ন, দেশ ও সমাজের সেই নীতিনির্ধারকরা, সেই ধর্মের পতাকাবাহীরা এদের জন্য কী নিদান দিতেন? এর উত্তর আমরা এখানে দিয়েছি। এই শাসক ও ধর্মধ্বজীরাই যোগাতেন এই জলদস্যুদের সব রকম লজিস্টিক সমর্থন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপনিবেশ বিস্তারের প্রধান শক্তি ছিল জলদস্যুতা। জলদস্যুতা কোনো রোম্যান্টিক বীরত্বের গল্প নয়। ইউরোপীয়দের নৃশংস অমানবতার পরিচয়। জলদস্যুতা যতটা দস্যুতা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল সাম্রাজ্য বিস্তার, দাসব্যবসা ও ধর্মান্তরণের সহজ উপায়। আর সব কাজের অনুঘটক অর্থলাভ ও ধনী হওয়া তার সহজতম উপায়। ইউরোপীয় রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মধ্বজীরা জলদস্যুতার মুখোশ পড়ে এই সব কাজে লিপ্ত ছিল। কিন্তু কোনো প্রচলিত ইতিহাসচর্চার প্রবর শাখায় এই চিত্র প্রতিফলিত হয় না।   

  

সুদীপ নারায়ণ ঘোষ