ভারত সভ্যতার উপর পরিকল্পিত আক্রমণ (১ম খণ্ড)

ভারত সভ্যতার উপর পরিকল্পিত আক্রমণ (১ম খণ্ড)

ভূমিকা

১৯২০ সাল নাগাদ ভারতবর্ষে দুটো সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনা দুটো প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ ব’লে চিহ্নিত হয়েছে, কিন্তু ভুল কারণে।

ভারতবর্ষ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন, উন্নত ও ধনী দেশ, বিত্ত ও জ্ঞান উভয়ার্থে। এই দেশের উপর শ্যেনদৃষ্টি ছিল প্রাকৃতিকভাবে বঞ্চিত কিন্তু দৈহিকভাবে সবল জাতিসমূহের। উদ্দেশ্য ছিল দুটো— এদেশের অর্থ লুণ্ঠন ক’রে ভোগ করা এবং এখানকার সমৃদ্ধ প্রাচীন সভ্যতাকে মুছে দিয়ে তাদের একদেশদর্শী, মূলত শূন্যগর্ভ জীবনশৈলী ও ধ্যানধারণা চাপিয়ে দেওয়া।  এই কাজের গোড়াপত্তন হয়েছিল ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ বিন কাশেমের ভারত আক্রমণের মধ্য দিয়ে, তা রাজনৈতিক কর্তৃত্বে রূপান্তরিত হয়েছিল মহম্মদ ঘোরীর বিজয়ের মধ্য দিয়ে । ক্রমশ: ভারত সভ্যতার উপর লক্ষ্যিত আক্রমণ শাণিত হয় দাস, খিলজি, তুঘলক, লোদী ও সর্বশেষ মুঘল আক্রমণে। কিন্তু এদের আক্রমণ ছিল ব্যাপকার্থে বাহুবলভিত্তিক।

এরপর শুরু হয় ইউরোপীয় আক্রমণ—পর্তুগিজ, স্পেনীয়, ফরাসী, ওলন্দাজ, দিনেমার ও ইংরেজ আক্রমণ। এখান থেকে শুরু হ’ল দৈহিক আক্রমণের সঙ্গে বৌদ্ধিক আক্রমণ। এরা বোঝাতে লাগল যে ভারতবর্ষ, সত্যের বিপরীতে গিয়ে অবশ্যই, অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন ও অনুন্নত। এদের এখানে যা কিছু অর্জিত হয়েছে তার জন্য কৃতিত্বের ভাগীদার মধ্য এশিয়া ও ইউরোপ থেকে আগত অধিবাসীরা। তারা কিছু ভাল জিনিস করেছিল কিন্তু এখানকার খারাপ পরিবেশে কলুষিত হয়ে যায়। বর্তমানে এরা অধঃপতিত, নিঃস্ব, রিক্ত, প্রায় অসভ্য, বর্বর। তারা এই ভ্রান্ত ধারণা চাপিয়ে দিল যে ভারতে আর্যরা এসেছিল খ্রিস্টপূর্ব দেড় হাজার বছর আগে মধ্য এশিয়ার আনাতোলিয়া অঞ্চল থেকে। প্রায় একই সময়ে যাদের অন্য শাখা গোষ্ঠী ইউরোপে গিয়েছিল এবং তৎকালীন মানে উনবিংশ শতাব্দীতে বিদ্যমান ইউরোপীয় উন্নত সভ্যতা তৈরী করেছিল । এখন তাদের উপর দায়িত্ব পড়েছে আবার এই দেশকে সভ্য করার। এই ছিল বৌদ্ধিক ছলনার সূত্রপাত।

কিন্তু ভারতবর্ষ জেগে উঠছিল তার লুপ্ত ইতিহাসবোধের পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে এবং এর প্রাচীন সভ্যতা, সুবিশাল সাহিত্য ও সংস্কৃতির নব্য উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। প্রমাদ গুণল পরের ধনে সমৃদ্ধ বিশ্ব ও আব্রাহামিক ধর্মীয় গোষ্ঠী। তারা আরো সুনিপুন, চতুর ও সূক্ষ্ম জাল রচনা করে যার সহস্রবাহু আজ এই ২০২৩ সাল পর্যন্ত এক শতাধিক বছর ব্যাপী ভারতবর্ষকে কুড়ে খাচ্ছে। এবং প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতাকে নিঃশেষ করার উদ্যোগ প্রায় সম্পূর্ণ করে ফেলেছে।

তারা সমসময়ে, ১৯২০র আশেপাশে দুটো অস্ত্র প্রয়োগ করল – গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংস আন্দোলন আর কম্যুনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া।  প্রথমত অহিংস আন্দোলন ব’লে সারা পৃথিবীতে কোনো দিন কিছু ছিল না এর আগে। পরেও কোনোদিন হয়নি। তবু এই অসম্ভাব্য মত চাপিয়ে দেওয়া হ’ল ভারতের উপর তাদের দ্বারা যারা ভারতবর্ষকে সর্বপ্রকার হিংসার মাধ্যমে শোষণ করেছে। আর যার মাধ্যমে এই তথাকথিত অহিংস আন্দোলন চালানো হ’ল তিনি না কোনো দিন আন্দোলন করেছেন না অহিংস ছিলেন। এর বিপরীতে শুরু হ’ল বিদেশের মাটিতে জন্মলব্ধ এক সম্পূর্ণ বিদেশী ধাঁচের ভাবধারা এবং সেটা আবার সহিংস। সেই বিদেশী ভাব তাত্ত্বিকভাবে ভ্রান্ত এবং প্রায়োগিকভাবে সর্বনাশা। এই দুই বিপরীত ভাবধারার মধ্যে বিরোধ অতি প্রবল কিন্তু এদের আভ্যন্তরীণ মিল ছিল, এরা যেন অসীমে এক বিন্দুতে মিলিত হয়। সেই বিন্দু হ’ল হিন্দু সভ্যতার সংহার।   

          এদের সম্পর্কে বলার আগে এর উপক্রমণিকা দরকার। তাই ‘ভারত সভ্যতার উপর পরিকল্পিত আক্রমণ’ নামের এই গ্রন্থের প্রথম অংশ ব্যয়িত হ’ল এই উপক্রমণিকা করতে। এর দ্বিতীয় অংশে আমরা মূল কথায় ফিরব।